সাগরদিঘি মডেলই কি মুর্শিদাবাদের গেমচেঞ্জার? ছাব্বিশের আগে নতুন অঙ্ক বিরোধী শিবিরে
এডমিন
ছবি: সংগৃহীত
মুর্শিদাবাদ :- ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে মুর্শিদাবাদের রাজনীতি ফের একবার অঙ্ক কষতে শুরু করেছে। প্রকাশ্য বাম–কংগ্রেস জোটের সম্ভাবনা প্রায় নেই। ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিক তৃণমূলকে চটিয়ে বাংলায় বামেদের সঙ্গে হাত মেলাতে চাইছে না কংগ্রেস। আবার তৃণমূলও স্পষ্ট—কংগ্রেসকে একটি আসন ছাড়ার প্রশ্নই নেই। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি শব্দ—‘সাগরদিঘি মডেল’।
সাগরদিঘি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৩ সালের সাগরদিঘি বিধানসভা উপনির্বাচন মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা। কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস তৃণমূল প্রার্থীকে প্রায় ২২,৯৮৬ ভোটে পরাজিত করেন। এটি কোনও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ছিল না, বরং একতরফা রায়। বাংলার উপনির্বাচনের চিরাচরিত নিয়ম—শাসক দল জেতে—এই ফলাফল সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে।
এই জয়ের নেপথ্যে ছিল বাম–কংগ্রেসের অঘোষিত আসন সমঝোতা। সিপিআই(এম) প্রার্থী দেয়নি, বরং কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করেছিল। ভোটের অঙ্কে বাম ভোট প্রায় পুরোটাই কংগ্রেসে ট্রান্সফার হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভোট ট্রান্সফারই তৃণমূলকে কার্যত ম্যাচের বাইরে ঠেলে দেয়।
উপনির্বাচন থেকে বিধানসভা—ফারাক কোথায়?
প্রশ্ন উঠছে, উপনির্বাচনের সেই মডেল কি পুরো বিধানসভা ভোটে কাজ করবে? বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক থাকলেও মুর্শিদাবাদের বাস্তবতায় সাগরদিঘির শিক্ষাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এই জেলা ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস ও বামেদের শক্ত ঘাঁটি। এখনও বহু আসনে দুই দলের ভোট শতাংশ যোগ করলে তা তৃণমূলের চেয়ে বেশি।
বিশেষ করে সেই সব কেন্দ্রে, যেখানে তৃণমূল গত দু’টি নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জিতেছে, সেখানে সাগরদিঘি মডেলের পুনরাবৃত্তি হলে শাসকদল বড় চাপে পড়তে পারে।
২০২৪-এর মেরুকরণ বনাম ২০২৬-এর মেজাজ
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদে প্রবল ধর্মীয় মেরুকরণ দেখা গিয়েছিল। রামনবমী ঘিরে হিংসা, পাল্টা রাজনীতি এবং উত্তেজক মন্তব্য ভোটের মেরুকরণকে তীব্র করে তোলে। সেই আবহেই কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী পরাজিত হন।
তবে এক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক আবহ বদলেছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। ওয়াকফ ইস্যু সহ একাধিক স্থানীয় বিষয়ে শাসকদলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে জেলার সংখ্যালঘু সমাজের একটি অংশে। একই সঙ্গে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও সামনে এসেছে।
ভোট ভাগের নতুন ফ্যাক্টর
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের জন্য বাড়তি মাথাব্যথা হয়ে উঠতে পারে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। হুমায়ুন কবীরের জনতা উন্নয়ন পার্টি মুর্শিদাবাদের মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভোট যদি ভাগ হয়, তাহলে তৃণমূলের জয়ের মার্জিন আরও কমে আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাম–কংগ্রেসের অঘোষিত সমঝোতা কার্যকর হলে বহু আসনে ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ে শাসকদলের অঙ্ক বিগড়ে যেতে পারে।
অধীর–সেলিম রসায়ন কতটা নির্ধারক?
প্রকাশ্যে জোট না হলেও অধীর চৌধুরী ও সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের রাজনৈতিক বোঝাপড়া নতুন নয়। সাগরদিঘিতে এই রসায়নই বাস্তবে কাজ করেছিল। ছাব্বিশের ভোটে একই ধরনের অঘোষিত সমঝোতা যদি মুর্শিদাবাদের একাধিক আসনে হয়, তাহলে তা জেলার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
শেষ কথা
প্রকাশ্য জোট নয়, বড় কোনও ঘোষণাও নয়—নীরব বোঝাপড়াই হতে পারে মুর্শিদাবাদের আসল গেমচেঞ্জার। সাগরদিঘি দেখিয়েছে, বিরোধী ভোট এক হলে তৃণমূলকে হারানো অসম্ভব নয়। প্রশ্ন একটাই—ছাব্বিশে কি সেই মডেল জেলার আরও আসনে প্রয়োগ হবে? তার উত্তরই নির্ধারণ করবে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
খবরটি শেয়ার করুন:
এডমিন
সিনিয়র রিপোর্টার
আজকের এক্স-এর সিনিয়র রিপোর্টার। রাজনীতি, নির্বাচন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্রেকিং নিউজ এবং বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরিতে দক্ষ।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য লোড হচ্ছে...



